ক্ষমতায়ণ: নারী-গরীব ও সামান্য ঠাট্টা

 

বিংশ শতাব্দীর মনস্বীরা সমাজ মানুষ ও পরিবেশ নিয়ে নিরন্তর চিন্তা প্রক্রিয়ার মাঝে আবিষ্কার করেন যে বিশ্ব অর্থনীতির উন্নতিকল্পে ‘যারা আছে পিছে’ তাদেরও ‘একই আসনে দিতে হবে ঠাঁই’। এর ব্যতিক্রমে সামাজিক সার্বিক উন্নয়ণ সম্ভব নয়। এই প্রশ্নেই উঠে এল নারী-পুরুষের সমানাধিকারের প্রশ্ন। উঠল সমশ্রমবন্টনের, ক্ষমতায় সমানাধিকার, সম মর্যাদা, অংশীদারিত্বের দাবী। সামনে ধরা পড়ল সমাজের অসমসত্ব বিভাজন। হৈ হৈ রব উঠল অর্ধেক আকাশকে সমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য। শুরু হল নারীর ক্ষমতায়ণের জন্য সক্রিয় প্রকাশ। বিশ্ব জোড়া আন্দোলন ও কর্মোদ্যোগের প্রক্রিয়ায় পাল্টে গেল উন্নত দেশগুলির চেহারা অনেকাংশে। কিন্তু গরীব সমাজগুলিতে বিশেষত উন্নয়ণশীল দেশগুলিতে এই প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ল। এরই আলোকে দেখা গেল সমাজের আরো নগ্ন রূপ—মানুষের আদিম লোভ ও গোষ্ঠী দখলের লড়াইয়ের আধুনিকতম রূপ। শুধু চাপিয়ে দেওয়া ময়ূরের পালকে কাকরূপী নারী উপরে হল সুন্দর, ভিতরে রয়ে গেল একটা নিষ্ঠুর অথচ সামান্য ঠাট্টা গোত্রীয় তেতো মাংস ভরা দেহ।

সময়টা বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ। বিশ্ব অর্থনীতিতে বিকল্প উন্নয়নের ধারণার বিস্তৃতির সাথে সাথে উপর-নীচ প্রকল্প (টপ ডাউন অ্যাপ্রোচ) ব্রাত্য হতে থাকে এবং নীচ-ওপর প্রকল্প (বটম আপ অ্যাপ্রোচ) গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এই পরিসরে ‘ক্ষমতায়ন’ (এমপাওয়ারমেন্ট) শব্দটি নজর কাড়ে। ১৯৬৮তে ব্রাজিলিও শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে তাঁর পেডাগজি অব দ্যি অপ্রেসেড বইতে দেখান কিভাবে প্রত্যেক সমাজে সামান্য কিছু ব্যক্তি সমগ্র জনগণের উপর ক্ষমতা চালায় এবং ফলস্বরূপ তৈরি হয় ‘ডমিনেটেড কনশাসনেস’। এর পরিপন্থী হিসাবে তিনি এমন এক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে চান, যাতে গরীব মানুষরা নিজেদের উন্নয়নের জন্য নিজেরাই উপাদান নির্বাচনে ও ব্যবহারে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হবে। নিজেদের পরিস্থিতি সম্পর্কে যারা সচেতন হবে। ডমিনেটেড কনশাসনেস থেকে তিনি মানুষকে পলিটিক্যাল কনশাসনেসে উন্নীত করতে চেয়েছিলেন যাতে তারা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সময় নির্বাচিত করার সুযোগ পায়।

আনুমানিক ১৯৭০ অবদি ইংরাজি ভাষাভাষী দেশগুলিতে ক্ষমতায়ন শব্দটির ব্যবহার সীমিত ছিল এরকমই বিভিন্ন সমাজসেবা, সামাজিক মনোবিদ্যা, জনস্বাস্থ্য বা প্রবীণ শিক্ষা বিষয়ক কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭২এ স্টকহোমে অনুষ্ঠিত পরিবেশ সম্মেলন এবং ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত দ্গ হ্যামারহোলদের রিপোর্ট হোয়াট টু ডু: অ্যান অল্টারনেটিভ ডেভলপমেন্ট-এর ফলশ্রুতিরূপে ১৯৭৬এ আইএফডিএ বা ইন্টারন্যাশানাল ফাউন্ডেশন ফর ডেভলপমেন্ট অল্টারনেটিভস-এর প্রতিষ্ঠা হয়। একই বছরে বারবারা সলোমন তাঁর ব্ল্যাক এমপাওয়ারমেন্ট: সোস্যাল ওয়ার্ক ইন অপ্রেসড কম্যুনিটজ বইটিতে এমপাওয়ারমেন্ট শব্দটিকে সামাজে ব্রাত্য ও প্রান্তিক মানুষ (যেমন আফ্রিকান আমেরিকান, এলজিবিটি, নারী বা মানসিক ও শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী মানুষ)-দের হয়ে আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োগ করেন। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘ক্ষমতায়ণএমন এক উপাদান যার মাধ্যমে গরীব এবং প্রান্তিক কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের ভালো থাকার জন্য তৈরি নীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে। আইএফডিএ মূলত সলোমনের বক্তব্যকেই আরো জোরালোভাবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে। তারা থার্ড সিস্টেম প্রোজেক্ট নামে তাদের দাবীগুলি পেশ করে, যেখানে গরীব ও মূলত মহিলাদের ক্ষমতায়ণকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা হয়। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরো বেশি সুবিধা সৃষ্টি, মানুষের কাছে পৌঁছনোর ক্ষমতা এবং উৎস স্থানীয়ভাবে এবং জাতিগতভাবে বৃদ্ধি করা, যাতে তারা পুনরায় সংগঠিত ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্ত শাসন ফিরে পেতে পারে। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু বুদ্ধিজীবী ও গবেষক ছাড়া এই প্রকল্প বিস্তার লাভ করতে পারেনি ফলে সাফল্য অধরা থেকে যায়। বলতে গেলে ১৯৮০র আগে পর্যন্ত উন্নয়ণের প্রেক্ষিতে ক্ষমতায়ণ সেভাবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ১৯৮০র পর থেকে ক্ষমতায়ণ শব্দটি র‍্যাডিকালদের হাত ধরে নারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয় এবং ১৯৯০ এত পর থেকে ধীরে ধীরে এই নীতি লিঙ্গবৈষম্য আন্দোলনের এজেন্ডায় স্থায়ীভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এখন থেকেই উন্নয়নের প্রকল্পে ক্ষমতায়ণ বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিজীবীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে এবং বিভিন্ন নারী সংগঠন, এনজিওগুলি মহিলাদের ক্ষমতায়ণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ও এর অগ্রগতিতে সামিল হতে শুরু করে, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের উন্নতিকামী দেশগুলিতে।

ভারতবর্ষীয় তথা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলির নারী আন্দোলন কর্মধারা, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি কর্মোদ্যোগ, সমাজ সংগঠক-বুদ্ধিজীবী-সমাজ কর্মীদের নিয়ে ডন (ডেভলপমেন্ট অল্টারনেটিভস উইথ উইমেন ফর আ নিউ এরা ) নামে একটি সংস্থা ১৯৮৪ সালে ব্যাঙ্গালোরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এরা তৃতীয় বিশ্বে উন্নয়ণের ক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন তৈরি করতে সমর্থ হয়। মহিলাদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধার পরিপ্রেক্ষিত আলোচনা করে, সম্ভাব্য উপায় ও অগ্রগতির নীতি নির্ধারণ নিয়েও বাকি বিশ্বের সাথে মত বিনিময় করতে শুরু করে। তৃতীয় বিশ্বের এই কাজকারবারের বিস্তৃত ধারণার ওপর ভিত্তি করে ১৯৮৭তে একটি বই প্রকাশ পায় ডেভলপমেন্ট, ক্রাইসিস অ্যান্ড অল্টারনেটিভ ভিশন্স: থার্ড ওয়ার্ল্ড উইমেন্স পার্সপেকটিভস নামে, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ণকে অবশ্যম্ভাবী একটি পন্থা হিসাবে উল্লেখ করে ভারত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয় ক্ষমতার হস্তান্তরের জন্য। এখানে বলা হয় বেঁচে থাকার জন্য প্রাথমিক প্রয়োজনটুকু অন্য মানুষের মতোই নারীকেও বিপন্ন করে; কিন্তু সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গঠন এবং আইনি বিধিই মহিলাদের ক্ষমতা দেওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বড় বাধা। ধর্ম -জাতি ও লিঙ্গ সংক্রান্ত বিভিন্ন অসুবিধা কাটিয়ে সরকারের উচিত অর্থনীতিতে মহিলাদের অংশীদারিত্ব দিয়ে দ্রুত দেশের অগ্রগতি ঘটানো। একই কথার প্রতিফলন দেখা যায় উপরি উক্ত বইটিতেও। বলা হয় নারীর ক্ষমতায়ণের জন্য দরকার:

. সামাজিক সম্পর্কের সমতা

. রাজনৈতিক সংহতি

. আত্মসচেতনতা ও শিক্ষা

ফ্রায়েডম্যানের মতে উন্নয়ণকামী দেশগুলিতে সমাজের অসম ক্ষমতায়ণের পুনর্নিমাণ প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্র অধিকতর দায়িত্ব নিতে সক্ষম হয়, নাগরিক সমাজের দায়িত্ব বৃদ্ধি পায় এবং কর্পোরেট তাদের সামাজিক দায়িত্ব বেশি করে পালন করতে পারে। এর অন্যথায় তাঁর মতে অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব নয়।

শ্রীলতা বটলিওয়ালা ক্ষমতায়ণকে সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি প্রক্রিয়া রূপে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন:

. সামাজিক সমস্ত রকম অসমতা (যেমন লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম) কে দূর করা

. অর্থনীতির নির্ধারক প্রাকৃতিক এবং মেধা সম্পদগুলির সাথে পরিচিতি ও ব্যবহারে নারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং

. বর্তমানে প্রচলিত ক্ষমতাধারী সিস্টেম যেমন পরিবার, রাষ্ট্র বা মিডিয়া বা এমন সংগঠন যারা এগুলিকে সংরক্ষণ ও পুনর্বহাল করতে সাহায্য করে, তাদের গঠনগত পরিবর্তন সাধন।

এইসব আলোচনা থেকেই উঠে আসে কতকগুলি প্রকল্প। ক্ষমতা পরিবর্তনের রূপরেখা পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হয়। পাওয়ার ওভারপ্রেক্ষিতের বিনাশ অনিবার্য হয়ে পড়ে। পাওয়ার টুএবং পাওয়ার উইথএর থেকেও আসন্ন হয়ে ওঠে পাওয়ার ফ্রম উইদিনএর ব্যবহার। ফলস্বরূপ ১৯৯৪র ইউনাইটেড নেশনের সম্মেলনে জনস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মুখ্য উপাদানগুলির একটি হিসাবে যেখানে নারীর ক্ষমতায়ণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল, সেখানে পরের বছরই বেজিংয়ের সম্মেলনে নারীর ক্ষমতায়ণকেই মুখ্য এজেন্ডা রূপে পেশ করা হয়। ঘোষণা করা হয়:

…women’s empowerment and their full participation on the basis of equality in all spheres of society, including participation in the decision making process and access to power are fundamental for the achievement of equality, development and peace. (১৯৯৫, চতুর্থ ইউনাইটেড নেশনস সম্মেলন)

এবং প্রত্যাশানুরূপ ইউএন মিলেনিয়াম সামিটে মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোলসের আটটি নির্ধারিত লক্ষের মধ্যে প্রোমোট জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি অ্যান্ড এমপাওয়ার উইমেন‘-কে তৃতীয় লক্ষ হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয়।

এসব নীতিকথা আউড়ে যখন কাজ করতে মাঠে নামা হল, তখন দেখা গেল সমস্ত ব্যাপারখানা আসলে উড়ো খই গোবিন্দায় নমো। বিশেষত ভারতবর্ষীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক আখড়ায় এমন বুদ্ধিবাগীশ দর্শণ শীতের পাতার মতো ঝরে পড়ল। একটা দেশের অর্থনীতি যখন পুরোটাই কর্পোরেট এবং বিশ্ব বাজারের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে, রাজনীতি দেশ পরিচালন ব্যবস্থা বা রাজ্যশাসন নীতির বদলে আখের গোছানোর জীবিকা হয়ে দাঁড়ায় তখন তার ফল এমন সুস্বাদু বিষাক্ত না হয়ে পারে না। ফলে দেশ, শাসক কিংবা বিশ্বব্যাঙ্ক বাজারের দিকে তাকিয়ে তৈরি করে তুলল ভুরি ভুরি উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট ক্ষেত্র; পোষাকি নাম সেলফ হেল্প গ্রুপ বা এসএইচজি। গ্রামে গ্রামে শহরতলিতে গজিয়ে উঠল তারা ব্যাঙের ছাতার মতো শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে, লাখে লাখে। সরকারি নীতি ঘোষিত হল স্বনিযুক্তিতে, সেল্ফ হেল্প গ্রুপে ভর্তুকি বিশিষ্ট ঋণ দেওয়ার। মানুষ বুভুক্ষুই ছিল, ঝাঁপ দিতে বাকি রাখল না। আর এরই নামে বিদেশীয় ব্যাঙ্কগুলির কাছে (বিশেষত বিশ্বব্যাঙ্ক) স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে টাকা ধার দেওয়ার সবচেয়ে কম খরচ সাপেক্ষ পন্থা খুলে গেল। কোটি কোটি টাকার বিপুল ঋণের বোঝা চাপল দেশীয় অর্থনীতির উপর। যা মেটানোর আগেই ঘাড়ে বাড়ল আরো সুদের বোঝা। সবটা সামাল দিতে বাড়ল করের পরিমাণ। কর্পোরেট চাটা রাজনীতিতে বাড়ল লক আউট। বাড়ল জিনিসের দাম। বাড়ল আমদানি। মরল আম আদমি। এমপাওয়ারমেন্টের নুন চাটিয়ে তখন শাসক তার দায়িত্ব সেরে পাততারি গুটিয়ে ফেলেছে। অথচ বেশিরভাগ এমপাওয়ার্ড মানুষ তখন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে উদয়াস্ত শ্রম বিক্রি করছে। বাজার মোটেই চায় না গরীব মানুষের ক্ষমতায়ণে উন্নয়ণ অংশীদার হোক বরং তারা দেখতে এবং দেখাতে আগ্রহী কিভাবে উন্নয়ণে গরীব মানুষ সিঁড়ি রূপে অংশগ্রহণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আসলে রাষ্ট্র মানুষকে ক্ষমতায়ণের নামে যন্ত্রে পরিণত করেছে। তার শ্রমের বদলে অর্থনীতি সচল থাকে, অথচ শ্রমিকের অবস্থার পরিবর্তন হয় না। অবস্থা অর্থে তার সর্বাঙ্গীন ভালো থাকা-শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, মননে, চিন্তনে, কৃষ্টি ও সৃজনে। অথচ রাষ্ট্রের প্ররোচনায় সে জানে ভালো থাকা মানে বাজার। মাল্টিপ্লেক্স, মাল্টিক্যুইজিন, মাল্টিজিমের মলাটে মানুষের বহুজাতিক ভালো থাকা গুঁজে দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ‘ক্ষমতায়ণ’ একটা বিশেষ শব্দবন্ধ মাত্র যার দ্বারা গরীব ও প্রান্তিক মানুষের শ্রম, স্বপ্ন ও যাবতীয় যাপন কিনে নেওয়া সম্ভব। ক্ষমতায়ণ বর্তমানে উপাদান ও যোগ্যতা বৃদ্ধির উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে । অথচ সমাজের মন মানসিকতায় না নারী, না জাতি, না ধর্ম, কেউই সমান অধিকারে প্রাপ্তবয়স্ক হতে পারেনি। বলা ভাল, হতে দেওয়া হয়নি। কখনও ধর্মের দোহাই দিয়ে, কখনও ঐতিহ্যের শৃঙ্খলায় আম জনতা সাতপাকে বাঁধা রয়েছে। তার ওঠা-বসা-হাসা-কাঁদা পদে পদে রাষ্ট্র ওরফে বিজ্ঞাপন ওরফে কর্পোরেট ঠিক করে রাখে। মানুষ শুধু তোতাকাহিনীর পাখির মতো বুলি আওড়ায়। তার ভিতরে শুকনো কাগজ খসখস করে।

রাজনীতির যাত্রাপালায় চলে আরো রোমহর্ষক কাহিনী। সেখানে নারীকে স্বমহিমায় ফেরাতে, নিজেদের গদি দীর্ঘজীবী করতে, নিত্য নতুন ফিকিরের উদ্ভাবন ঘটে। কখনও স্কুল যাওয়ার সাইকেল, বিয়ের সময় চার গ্রাম সোনা উপহার অথবা পড়াশোনা চালানোর জন্য অনুদান ঘোষণা করে দাতা ঈশ্বরীয় ক্ষমতা লাভ করেন। অথচ যে মানুষটাকে ক্ষমতায় পৌঁছে দেওয়ার দরকার ছিল, যাতে তাকে দানের দয়ায় বাঁচতে না হয়, যাতে সে নিজের যাবতীয় প্রয়োজন নিজেই যোগাড় করতে সক্ষম হয়, সেই ব্যবস্থা করা হল না। থালা গ্লাস বাটির উপঢৌকন দিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে ছবি তুলে ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় নথিবদ্ধ করা হবে, কোটি টাকা খরচ করে স্বচ্ছ ভারত অভিযান’ করা হবে অথচ শিক্ষা ব্যবস্থাকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হবে না; যাতে মানব সম্পদের অপব্যয় রদ করা সম্ভব হত, যাতে শিক্ষাই শেখাতো পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনীয়তা। এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, এক সামাজিক পরিস্থিতি, যাতে মানুষ চলার পথে তার সঙ্গী/সঙ্গীনীকে নিজেই বেছে নিত। কিভাবে সে তার সাথে জীবন অতিবাহন করবে তারও দায়িত্ব সে নিজেই নিত। ধর্মের দোহাই দিয়ে, নিয়ম নীতির আবর্জনার মাঝে পণ দেওয়া, লোক খাওয়ানো, অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন পড়ত না। দানের অপেক্ষায় চাতক হতে হত না। মহিলা ও গরীব মানুষের তথাকথিত এবং বিজ্ঞাপিত ক্ষমতা ফলত অর্জিত নয়, তা দানসামগ্রী। রাজ্য বা রাষ্ট্র প্রশাসনের কাছে তা পরিসংখ্যান মাত্র যার দ্বারা বহির্বিশ্বের কাছে নিজেদের ওজর জাহির করা যায়। ক্ষমতায়ণ এদের জন্য কোনও দীর্ঘমেয়াদি, ক্রমপরিবর্তনশীল সক্রিয় পদ্ধতি নয়। বরং একটা পূর্বনির্ধারিত লক্ষমাত্রা যা পূরণ করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের তীব্র ভাষায় এর সমালোচনা করে বলেছিলেন:

আমাদের দেশে সরকারবাহাদুর সমাজের কেহই নন, সরকার সমাজের বাহিরে। অতএব যে-কোনো বিষয় তাঁহার কাছ হইতে প্রত্যাশা করিব, তাহা স্বাধীনতার মূল্য দিয়া লাভ করিতে হইবে। যে-কর্ম সমাজ সরকারের দ্বারা করাইয়া লইবে, সেই কর্মসম্বন্ধে সমাজ নিজেকে অকর্মণ্য করিয়া তুলিবে। অথচ এই অকর্মণ্যতা আমাদের দেশের স্বভাবসিদ্ধ ছিল না। আজ আমরা সমাজের সমস্ত কর্তব্য নিজের চেষ্টায় একে একে সমাজবহির্ভুক্ত স্টেটের হাতে তুলিয়া দিবার জন্য উদ্যত হইয়াছি।

কেন এই সরকারি দানের ওপর নির্ভর করে নিজেকে অকর্মণ্য করে তোলা? অথচ অন্য উপায়ও নেই। কারণ সরকার বাহাদুর আমাদের বশ্যতা কামনা করেন। আমরাও পোষ্য হতে ভালোবাসি। আমাদের চেতনা গড়ে ওঠেনি। বোধ ঘুমোচ্ছে। ফলে আমাদের ধকনেই সিলেবাসের বাইরে পড়াশোনা করার, স্কলারশিপের বাইরে টিউশনির টাকায় পড়াশোনা চালানোর, চাকরির বাইরে চপশিল্পে হাত পাকানোর। অকর্মণ্যতা, বিলাসিতা, কর্মবিমুখতা আমাদের গ্রাস করেছে। ফলে রাজনীতি আমাদের অনিবার্য ধর্মপীঠ। ভোট আমাদের মুক্তির একমাত্র উপায়। শাসক বা রাজাই আমাদের ঈশ্বর।

 
 
top