মাদ্রাসা শিক্ষা

 
 

আজ থেকে ঠিক আশি বছর আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পুতুল নাচের ইতিকথা-(১৯৩৬) দেখিয়েছিলেন কিভাবে ক্ষুদ্রস্বার্থ রাজনীতির গিলোটিনে মানুষের বিবেক ও বিচারবোধ অসহায় ভাবে নির্বিকার। প্রচলিত পরিকাঠামোয় চূড়ান্ত অরাজনৈতিক মানুষেরও জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত অবিশ্বাস্য ঘূর্ণাবর্তে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। অথচ তা আমাদের বোধের অতীত। আমরা ঠিক মুজতবা আলির মতোই অন্ধ; রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির রূপটি চিনিয়ে না দিলে তিনি যেমন সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করতে পারেন না, আমরাও তেমন রাজনীতি বুঝতে তথাকথিত দলগুলির উপর নির্ভর করে থাকি। যতক্ষণ না কোন ক্ষুদ্র ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানোতর, দোষারোপ-প্রতিদোষারোপ চলছে, ততদিন সেটা সাত নম্বর পাতার খবরের মতোই গুরুত্বহীন। উপন্যাসের নামটিও প্রাসঙ্গিক। পুতুলের মতো নেচে চলেছি আমরা সবাই, নিজেদের পারদর্শিতা ও ক্ষমতায় বেশ আনন্দ অনুভূত হচ্ছে। অথচ জানিই না যে সুতো পরা আঙুলগুলোই আসলে মালিক। এই যেমন দেশ-বিদেশ জুড়ে একের পর এক সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ঘটে চলেছে, আর ওই শয়তান মুসলিমগুলোকে আমরা কিছুতেই আটকাতে পারছি না ভেবে ট্রেনে-বাসে-কর্মক্ষেত্রে-আড্ডায় মুসলিমের পক্ষে-বিপক্ষে বিষোদ্গার করছি অথবা নীতিগর্ভ ভাষণ আওড়াচ্ছি। একবাক্যে স্বীকার করছি, পাকিস্তানী শিক্ষাতেই হারামিগুলো মানুষকে মানুষ মনে করে না; গরু ছাগলের মতো খালাস করে দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পাকিস্তানে গিয়ে তো সবাই শিক্ষা নিয়ে আসছে না। সেই সুবিধা নেই। তাহলে? কেউ কেউ খুব সহজ সমাধান করে ফেলে: মাদ্রাসা গুলোই এইসব সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের আঁতুড় ঘর অথচ মাদ্রাসা জিনিসটা কিখায় না গা ধোয়? এ সম্পর্কে আমজনতা হিন্দুর কোন নির্দিষ্ট ধারণা নেই। জনাকয়েক কিঞ্চিৎ শিক্ষিত জানেন, মাদ্রাসা মানে মুসলিমপ্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একমাত্র আমাদের মতো যে অভাগা হিন্দুরা জাত-কূল খুইয়ে মাদ্রাসায় চাকরি করে পেট পালন করি, আর বাড়ি ফিরে গঙ্গাজল ছিটিয়ে তবে বিছানায় উঠি, তারা মনে করি খারাপ—কিন্তু চলে যায়, এই পর্যন্ত। একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কেন এমনটা ধারণা হল? খামতি কোথায়? রাজনীতিটাই বা কোথায়?

১৮৩৪ সালে লর্ড থমাস বেবিংটন মেকলে ভারতের বড়লাট হয়ে আসার পর শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করতে চান। তাঁর লক্ষ ছিল ইন্ডিয়ান ইন বার্থ অ্যান্ড ইংলিশ ইন থট। ফলে কেরাণী-শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিবাদ স্বরূপ একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবেই মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। মুসলিম এবং হিন্দু অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া ভারতবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল সেখানে। রামমোহন রায়, রাজেন্দ্র প্রসাদ, সচিদানন্দ সিংহ প্রমুখের মতো উনিশ শতকের প্রগতিশীল ব্যক্তিরা মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। দীন--মাদারি আন্দোলন মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়। মাদ্রাসা গঠনের প্রাথমিক শর্ত হিসাবে উল্লেখ করা হয়:

. মাদ্রাসাগুলি সাধারণ মানুষের অনুদানে গড়ে উঠবে।

. মাদ্রাসা বয়স-জাতি-ক্ষমতা নিরপেক্ষভাবে সব মানুষকে অবৈতনিক শিক্ষা প্রদান করবে।

. প্রতিষ্ঠানগুলি হবে একান্তভাবেই গ্রামীণ সভ্যতামুখী।

সমস্ত সম্ভাব্য গ্রামে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হবে মানুষের হাতের নাগালে শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। তথাকথিত উচ্চবিত্ত ইংরাজী শিক্ষার্থীর প্রতিপক্ষে নান্দনিক-আধ্যাত্মিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলাই ছিল এর প্রাথমিক দায়িত্ব। পাঠ্য বিষয় ছিল উর্দু, আরবী, ফারসি ও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা, তৎসহ ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব। ভাষা ও দর্শণ শিক্ষাই ছিল এর ভিত্তি।

কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে প্রেক্ষাপট পাল্টাতে শুরু করে। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিভাজন হওয়ায় এদেশে মুসলিমের সংখ্যা একলাফে বেশ খানিকটা কমে যায়। সংখ্যালঘু মুসলিম রাষ্ট্রকে ভালবেসেই এদেশে থাকে। অথচ তাদের প্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্র সেদিনও ব্যর্থ ছিল, আজও তাই। সংখ্যালঘু প্যাকেজ সংখ্যালঘুর সার্বিক উন্নয়ন করতে পারে না। উপরন্তু অন্যান্য সংখ্যালঘুদের তুলনায় মুসলমানের অহং আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল বেশি। এদেশে তাদের অধিকার ছিল সমান-সমানের। সেখান থেকে ধর্মের কারণে তাদের নামতে হয়েছিল নীচের সারিতে। এই দোলাচল অবস্থায় মুসলিম জনগোষ্ঠী নিজেদের অবহেলিত মনে করে আরো সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টায় রক্ষণশীল হয়ে ওঠে। মাদ্রাসা ব্যাবস্থা ধীরে ধীরে ধর্মীয় পরিমণ্ডলে অচলায়তন হতে শুরু করে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নিজেদের অস্তিত্বের লড়ায়ে জেরবার মুসলিম সমাজ মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে সমান্তরাল প্রতিস্পর্ধী শিক্ষা পরিকাঠামো গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে পরাজিত হয় এবং ক্রমশ প্রান্তিক হতে থাকে, তবু ধর্মীয় অনুদানে তারা এখনও জীবিত এবং ক্রমবর্ধমান।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু উন্নয়ণ মন্ত্রকের কাছে ভারতবর্ষ জুড়ে কয়টি মাদ্রাসা চালু, তার কোনও হিসাব নেই। ভারতবর্ষের অধিকাংশ মাদ্রাসা দারুল-উলুম-দেওবান্দ শিক্ষাব্যাবস্থার অন্তর্গত। আশ্চর্যজনক ভাবে এরা আজও অষ্টাদশ শতাব্দীর মোল্লা নিজামি প্রবর্তিত দারস--নিজামি পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। রাজনীতি এখানেই যে, বিজেপি বা কংগ্রেস, বামপন্থী বা ডানপন্থার সব সরকারই মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক অক্ষুন্ন রাখতে মৌলানা-মৌলবী পোষিত এইসব মাদ্রাসায় হস্তক্ষেপ করেনি, করছে না। ফলে দিনের পর দিন বহির্বিশ্বের অগ্রগতির সাথে পিছিয়ে পড়ে মাদ্রাসাগুলি কেবল মৌলানা (মসজিদ পরিচালনাকারী) ও হুজুর (মাদ্রাসার শিক্ষক) ব্যতীত আর কিছু তৈরী করতে অক্ষম। এখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ কোন অন্য জীবিকা অর্জনের সুযোগ নেই। গণিত শাস্ত্র এখানে বিজ্ঞানের অংশ হিসাবে নয় ব্যবহারিক বিষয় হিসাবে পড়ানো হয়, গণনা কার্যের সুবিধার্থে। বিজ্ঞান পড়ানো হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা খন্ডিত জ্ঞান লাভ করে। কিন্তু এসব সত্বেও স্বীকার করতে হবে মাদ্রাসা ভারতবর্ষের বৃহৎ সংখ্যক মুসলিম জনগণের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে যা সাধারণ বিদ্যালয় শিক্ষা পারেনি। এসবের পরোয়া না করেই বিজেপি সাংসদ সাক্ষী মহারাজ মাদ্রাসাকে সন্ত্রাসবাদ শিক্ষাকেন্দ্র বলে মন্তব্য করতেই পারেন। পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে নিজেদের সুবিধার জন্য সরকার উন্নত করতে চায় না, তার দায় কি জনগণের? মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই মাদ্রাসাগুলোকে একশো কোটি টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে তাদের স্কুলবাড়ি, বইপত্র, পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য। অথচ সেগুলিকে সরকারী ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করে তাদের আমূল পরিবর্তন সাধন সম্ভব ছিল। সরকারী নজরদারীর সীমানায় থাকলে কোন সংস্থাই বেআইনি কিছু করার দুঃসাহস দেখায় না। উপরন্তু টাকার অভাবে অনৈতিক, অসাংবিধানিক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়া বা লোভের কাছেহুমকির কাছে নতি স্বীকারও কঠিন হয়। শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান বাড়লে জীবনের মানও উন্নত হবে। ঔচিত্যবোধও বাড়বে। ভারতীয় মুসলিমদের মূল সমস্যাই গরীবি, যা নিরসনে সরকারের কোনও ভূমিকা নেই। মুসলিম নয়, আসলে মৌলবাদ তোষন করে সরকার নিজের কুর্সি ঠিক রাখতে চায়। মৌলানাদের প্রবল আধিপত্য থেকে সাধারণ গরীব মুসলিমদের মুক্তি দেখাতে পারত যে যথার্থ শিক্ষা, তার যোগানই অপ্রতুল। বিত্তবান মুসলিম কিন্তু সাধারণ বিদ্যালয় ব্যাবস্থার ভিতরেই বিদ্যমান। এমনকি তার কাছেও মাদ্রাসা নাক সিটকানো ব্যাপার হয়ে থাকে।

অন্যদিকে দেশের বাৎসরিক আয়ের অর্ধেক পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে প্রতিরক্ষা খাতে সরাসরি। এর আনুষঙ্গিক খরচ, যেমন সামরিক বাহিনীর নানা রকম সুযোগ-সুবিধা, জীবন নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ মিলিয়ে শতাংশটা ষাটের উর্দ্ধে। একটা বিপুল পরিমাণ অর্থ যা অস্ত্র কেনায় খরচ হয়, তা চলে যায় দেশের বাইরে মূলত আমেরিকা, রাশিয়া, ইজরায়েল, ফ্রান্স, জার্মানির মতো মোড়ল দেশগুলোয়। এই দেশগুলোই আসলে একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব জিয়িয়ে রেখে নিজেদের মুনাফা নিশ্চিত করে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজে কি কম সন্ত্রাসবাদী? ব্রেনওয়াশ করানো জেহাদীরাও মনে করে তারা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই যুদ্ধ করছে, যেমনটা রাষ্ট্র মনে করে অন্য রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে। আবার ভোটের আগে প্রতিটি রাজ্যের প্রতিটি রাজনৈতিক দল যেভাবে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে যথেচ্ছ বোমা-পিস্তলের ব্যবহার করে, তাতে মনে করা কি সমিচীন নয় যে এই রাজনৈতিক ছাতাগুলোই আসলে সন্ত্রাাবাদের আঁতুড়? সবক্ষেত্রেই যথাযথ শিক্ষা ছাড়া এই ক্ষয় রোধের দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মাদ্রাসার চরিত্র বহুদিন যাবৎ দেশের অন্য প্রান্তের তুলনায় আলাদা ছিল। স্বাধীনতার সালেই মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ড, বেঙ্গল- প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৫০ সালে আলাদা ভাবে ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অফ মাদ্রাসা এডুকেশন তৈরি হয়। ১৯৯৪ সালে মাদ্রাসা বোর্ডকে স্বয়ংক্রিয় সংস্থা রূপে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা মডেলের সবথেকে বড় সুবিধা এই যে, মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম থেকে শুরু করে শিক্ষক নির্বাচন পর্যন্ত, এমনকি শিক্ষার্থীদের পোষাক, বই, উচ্চতর শিক্ষার জন্য সহযোগিতা সমস্ত দায়িত্বটাই সরকার পালন করে। ফলস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গের প্রচলিত বিদ্যালয় ব্যাবস্থার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষা সমান্তরাল এবং জীবিকার প্রশ্নে সমকক্ষ। ধর্মীয় অনুভূতিকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে ইসলাম পরিচয় এবং আরবী বাধ্যতামূলক বিষয় ছাড়াও, যুগোপযোগী বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যের পাঠ, এমনকি কর্মশিক্ষা, শারীরশিক্ষার পাঠও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা একভাবে টোটাল এডুকেশন সিস্টেম-এর মধ্যে বেড়ে ওঠার অবকাশ পায়। মজা হল এখানেও রাজনীতির চড়া রং দেখা যায়। যেখানে পশ্চিমবঙ্গের মডেল নিয়ে কেরালা-কর্ণাটক তাদের মাদ্রাসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে ফেলল (রাজ্যের সমস্ত মাদ্রাসাই সরকার পোষিত), সেখানে পশ্চিমবঙ্গের স্বীকৃত ও সরকার পোষিত ৬১৫টি মাদ্রাসার বাইরেও অন্তত দশ হাজার খারিজি বা অনিবন্ধিত মাদ্রাসার অস্তিত্বের কথা বলেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও সংখ্যাটা কোন সমীক্ষালব্ধ ফল নয়, এ নিয়ে রাজ্য সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা পরিষদের কাছে কোনও তথ্য নেই। মাদ্রাসা আইনে যখন বলা ছিল, সমস্ত স্বীকৃত এবং অস্বীকৃত মাদ্রাসাকে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন হতে হবে এবং তাদের নির্দিষ্টকৃত নীতি মেনে চলতে হবে, তবুও এই মাদ্রাসাগুলোকে কেন অন্তর্ভুক্ত করা হল না? বর্ধমানের খাগড়াগড় মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ মাদ্রাসা শিক্ষার এই অবহেলিত ও তুচ্ছজ্ঞান মনে করা বিষয়কে চোখে আঙুল দিয়ে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করায়। দু-চারদিন আমরাও অসহিষ্ণু হয়ে উঠি ভয়ে। ২ অক্টোবর, ২০১৪ থেকে গড়িয়ে ২০১৫ পার করেও সমস্যার তিমির কাটেনি, বরং বেড়েছে। মোদি সরকার গোমাতা পুজো করে মহারাষ্ট্রে গোমাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করবেন। দিকে দিকে গরীব মুসলিমকে চকচকে তরোয়ালের ধারে হিন্দু বানানো হবে। আবার লোকদেখান্তি মাদ্রাসায় একশো কোটির অনুদানও দেবেন। আর মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রের অনুদানের ওপর ফোঁপরদালালি করবেন। ভোটের আগেই আশ্বাস দেওয়া অস্বীকৃত মাদ্রাসার শিক্ষকদের সাথে প্রতারণা করে তাদের স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে অনশনে বসতে বাধ্য করা হবে। তারপর তাদের জেদের কাছে নতি স্বীকার করে কেবল স্বীকৃতি দেওয়া হবে, অন্য কোনও দায় গ্রহণ করা হবে না। অর্থাৎ এই নবস্বীকৃত মাদ্রাসাগুলো কেন্দ্র প্রদত্ত মাদ্রাসাভিত্তিক অনুদান পাবে (উল্লেখিত একশো কোটির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ যার মাত্র ছয় কোটির ভাগ পেয়েছে। এই মাদ্রাসাগুলো স্বীকৃতি লাভ করায় আগামী বছর মাদ্রাসা সংখ্যার ভিত্তিতে অনুদানও বৃদ্ধি পাবে।)। অথচ এই মাদ্রাসাগুলোয় সরকারের কোন বক্তব্যের অধিকার থাকবে না। মানে টাকা দেওয়া হবে উন্নতির জন্য কিন্তু উন্নতি হচ্ছে কিনা তা তদারকি করার আদৌ অধিকার থাকবে না। এই বিকেন্দ্রীকরণের প্রচেষ্টা সাধুবাদী। কিন্তু সাধু মানুষ কি আর আছে? উন্নতির নামে জলসা হলে, তার খবর রাখবে কে? একইভাবে ভাবনার বিষয় কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুর ও জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চের মাদ্রাসা সংক্রান্ত রায়। সেখানে বলা হয়েছে মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতাসীন মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন অসাংবিধানিক। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের শিক্ষাগত উন্নয়নের দায়িত্ব নেবে নিজেরাই। এক্ষেত্রে সরকারের কোনও হস্তক্ষেপ থাকবে না। ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হবে যে প্রতিষ্ঠানে তার সাথে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার বিযুক্ত থাকবে। যুক্তি যথাযথ, সুতরাং মাদ্রাসার পরিচালন সমিতির সদস্যরা নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রণ করবে পরবর্তী মাদ্রাসা শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া। একইসাথে বলা হয়েছে ২০০৮ থেকে ২০১৪ অব্দি নিযুক্ত শিক্ষকরা বহাল থাকবে কি না তাও বিবেচনা করবে মাদ্রাসা পরিচালন সমিতি। সমস্যা যে ছয়শোর বেশি মাদ্রাসায় নিযুক্ত পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষক সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত যোগ্যতামানে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি করছেন। এখন তাদের ভবিষ্যৎ পরিচালন সমিতির হাতে নির্ভর করাটাও একই রকম অসাংবিধানিক। দীর্ঘ সাতবছর সরকারী চাকরি করা এবং পিএফ ফান্ডে টাকা জমানোর পর, একদিন সকালে হঠাৎ কি করে তার জীবিকা অনিশ্চিত করে দিতে পারে কোর্ট বা সরকার কেবল ধর্মের নিরীখে? মাদ্রাসার পরবর্তী নিয়োগে পরিচালন সমিতি কতটা দুর্নীতি করবে তার থেকেও বড় প্রশ্ন মাদ্রাসায় পাঠরত শিক্ষার্থী, যার বড় অংশ আজও প্রথম প্রজন্ম শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবকদের কতখানি যোগ্যতা আছে শিক্ষকের গুণগত মান নির্ণয়ে! স্বার্থান্ধ শিক্ষক প্রতিনিধি বা প্রধান শিক্ষকের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করলেও ইচ্ছুক প্রার্থীর একাডেমিক স্কোর চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মান্যতা পাবে। অথচ সরকার চাইছে গ্রেড নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ও নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়ণ ভিত্তিক বিকাশ। অথচ কর্মযোগ্যতা বিচার করার পদ্ধতি থেকে যাচ্ছে সেই আদম যুগের নাম্বার নির্ভরতায়। তাহলে শুধুই কি কাগুজে উন্নয়ণ হবে? নাকি এইসব নির্ধারণ মাপকাঠিতে নিজেদের শাসনকালকে উন্নততর প্রতিপন্ন করে আসলে তৈরি করা হচ্ছে অদক্ষ-ডিগ্রীধারী-হতাশ শ্রমিক যুবক। আর এভাবে চিন্তার স্বচ্ছতা মুছে নিজেদের সিংহাসন দীর্ঘস্থায়ী করছেন সকলে!

দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনে নতি স্বীকার করার অভ্যাসবশত মিশনারিজ শিক্ষা আমাদের কাছে উন্নত। নামের আগে সেন্ট বসানো গন্ধ থাকলেই জনগণ মৌমাছির মতো সন্তানদের উন্নতিকল্পে লাইনে দাঁড় হয়—এসব দৃশ্যে এখন নাগরিক এমনকি শহরতলীর জীবন অভ্যস্ত। মিশনারিজদের পদাঙ্ক অনুসরণে মঠ ও মিশন পদ্ধতি ভারতীয় সংস্কৃতি শিক্ষার নামে যথেচ্ছ হিন্দুত্ববাদী বীজবপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ঐতিহ্যশীলমা-বাবা এতেও গর্বিত হন। অথচ সাম্প্রতিক অতীতে অহরহ এমন উদাহরণ সত্তর-আশি বয়সওয়ালা তেমাথা লোকগুলোর স্মৃতিতে উজ্জ্বল যখন বিদ্যালয়ে একই পিরিয়ডে আলাদা আলাদা শ্রেণিকক্ষে পছন্দমতো (ধর্মের ভিত্তিতে নয়) আরবী, উর্দু বা সংস্কৃত পড়া ছিল বাধ্যতামূলক। সেটাই ছিল প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা যা ধর্মনিরপেক্ষ দেশে বর্তমান থাকা উচিত। মিশনারী-মঠ, মিশন-মাদ্রাসা সব কিছুর প্রতিস্পর্দ্ধায় সাধারণীকৃত বিদ্যালয় ব্যাবস্থা থাকবে। ধর্মপালন যদি কারোর ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকে, তবে উচিত বন্ধ দরজার ভিতর ব্যক্তিগত স্তরে তা পালন করা।

সমস্যার সমাধান খোঁজাটা আসল উদ্দেশ্য নয়, সমস্যার শিকড়ে পৌঁছালেই সমাধান আপনা আপনি উৎসারিত হয়ে আসে।

(এই প্রবন্ধে প্রকাশিত অভিমত ও তথ্যের যাথার্থ্য প্রমাণের দায় সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব।)

 
 
top